শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব
শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব

Rate this post

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব

মূল: মাওলানা ইসমাইল রেহান হাফি

অনুবাদ: মুসাব্বির আহমদ তাওসিফ

পাশা নিজ বহরকে তিন ভাগে ভাগ করেন। তাঁর যুদ্ধ চার এতই আজীব ছিল যে, ইউরোপীয় ক্যাপ্টেন হয়রান হয়ে গিয়েছিল। মাত্র পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধের পর ইউরোপের সম্মিলিত নৌশক্তি সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল। অল্পসংখ্যক সৈন্য বেশ জিল্লতি ও লাঞ্ছনার সাথে পলায়ন করতে পেরেছিল। এই বিজয়ের খবর যখন সুলতানের কাছে পৌঁছল তখন তিনি আনন্দে ও কৃতজ্ঞতা স্বরূপ দাঁড়িয়ে যান এবং এ সংবাদ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনেন। ভেনিস প্রজাতন্ত্র এবং ইতালি এই পরাজয়ের পর ক্রোয়েশিয়ার তীরসহ ওই সমস্ত দ্বীপ যেগুলো খাইরুদ্দিন পাশা বিজয় করেছিলেন সেগুলো থেকে হাত গুটিয়ে নেয় এবং মাত্র তিন লাখ ডুকেট এর বিনিময় বাবে আলীকে অর্পণ করে।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব

খাইরুদ্দিন পাশা নিজ ছেলে হাসান বেগকে আলজেরিয়া প্রেরণ করেন এবং সেখান থেকে স্পেনের তীরবর্তী এলাকায় হামলা করতে বলেন। হাসান বেগ মুসলমানদেরকে আফ্রিকা স্থানান্তরের কাজও করছিলেন এবং সেখানকার মুজাহিদদেরকে অস্ত্র ও পৌঁছাচ্ছিলেন। এসময় তিনি দ্বিতীয়বার জাবালুত তারেক (জিব্রাল্টার প্রণালী) দখল করেন। স্পেনের সম্রাট পঞ্চম চার্লস হাসান বেগের এ সমস্ত হামলায় অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল ।

সে একটি চাল চললো এবং খাইরুদ্দিন পাশাকে আলজেরিয়ার বাদশা বানানোর প্রস্তাব দিল এই শর্তে যে তিনি উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। সম্রাট চার্লস খাইরুদ্দীন পাশাকে দেওয়া তার প্রস্তাবে এই আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, তার থেকে অল্প ট্যাক্স নেওয়া হবে এবং স্পেনের সাহায্য সহযোগিতার হাত সর্বদায় তার সাথে থাকবে। খাইরুদ্দীন পাশা এই ঘৃণ্য প্রস্তাবকে বেশ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে ফিরিয়ে দেন এবং শত্রুর সামনে এটা স্পষ্ট করে দেন যে, আল্লাহর পথে নিজের জান কোরবান করা এতই মূল্যবান যে দুনিয়ার কেউই এর মূল্য দিতে পারবে না।

খাইরুদ্দীন বারবারোসা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সম্রাট পঞ্চম চার্লস এই পরিমাণ ক্রোধান্বিত হয় যে, সে ১৫৪১ সালে আন্দ্রে ডোরিয়া কে সাথে নিয়ে আলজেরিয়া হামলার উদ্দেশ্যে বের হয় স্পেন, সিসিলি, মাল্টা এবং জার্মানীর শাসকগণ, সুপ্রসিদ্ধ নাইট ও দুর্গ পতিরাও সাথে ছিল। বহরটি ৫১৬ টি জাহাজ এবং ৩৬ হাজার সৈন্যে সজ্জিত ছিল। আর এদিকে আলজেরিয়ার নৌবহর অন্য রণাঙ্গণে চলে গিয়েছিল। তথাপি খাইরুদ্দীন পাশা ও নেই।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব

খাইরুদ্দীন পাশার ছেলে (আলজেরিয়ার নায়েব শাসক) হাসান বেগ এর কাছে মাত্র ৬০০ সৈন্য ছিল। তিনি বেশ কষ্ট করে আরো ২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করতে সক্ষম হন। আশংকা ছিল যে, এইবার স্পেনকে আলজেরিয়া দখল থেকে কেউ বাঁধা দিতে পারবে না। কিন্তু হাসান বেগ নিজের অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়েই দুশমনের মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নেন। স্পেনীয় বাহিনী আলজেরিয়ার তীরে এসে তাঁবু গেড়ে বসে। তাদের একটি দল কেল্লা অবরোধ করার জন্য আসে। হাসান বেগ হঠাৎ তাদের উপর হামলা করে বসলে তারা অবরোধ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ওই রাতেই হাসান বেগ শত্রুপক্ষের ছাউনীতে বেশ শক্তিশালী হামলা করে বসেন। যার ফলে ৩ হাজার খ্রিস্টান মারা যায়। সম্রাট চার্লস এর আর সামনে বাড়ার সাহস হলো না।

সে হুকুম দিলো যে পুরো বহর জাহাজে আরোহন করে ফিরে যাওয়ার। ফৌজ জাহাজে আরোহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইতিমধ্যেই অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে। হাসান বেগ যিনি আফ্রিকার তোফানগুলোতে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি এসব কিছু দেখছিলেন। আল্লাহর নুসরাত তাঁর সাথে রয়েছে। অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে এই জয় তাঁর আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে তুলেছে। তাই তিনি স্পেনীয় সম্রাটকে এমন শিক্ষা দিতে চাচ্ছিলেন যেন সে দ্বিতীয়বার আলজেরিয়ায় দিকে আসার সাহস না করে। অন্ধকারের হাঙ্গামা থেকে ফায়দা হাসিল করতে তিনি আচমকা খ্রিস্টানদের উপর হামলা করে বসেন এবং তাদের বিশটির মতো জাহাজ নিশানা করে গোলাবর্ষণে ডুবিয়ে দেন। দুশমনের গোলাবারুদ এর গুদাম ডুবে যায়। ২০ হাজার স্পেনীয়, জার্মান ও ইতালি সৈন্য মারা যায়। তুর্কিরা তাদের ঘোড়াগুলো ও ছেড়ে দেন যাতে শত্রু পক্ষের কেউ স্থলপথে পলায়ন করতে না পারে।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব

ইউরোপের কয়েকজন নামকরা শাহজাদা, নাইট ও দুর্গপতি বন্দি হয়‌ । অক্ষত অবস্থায় ১৩০ টি জাহাজ হস্তগত হয়। ডুবতে থাকা একটি জাহাজে মুসলিম কয়েদিরা ও ছিল। তাদের মধ্য থেকে ১৮০০ জন কে জীবিত উদ্ধার করেন। চার্লস ১০-১৫ হাজার সৈন্য নিয়ে পলায়ন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই পরাজয় ও ক্ষতির কারণে পথিমধ্যে আফসোসের হাত মারতে মারতে কাঁদছিল। রাগে-দুঃখে নিজের শাহী টুপি খুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে‌। সুলতান সুলাইমান এই বিজয়ের সংবাদ ইস্তাম্বুলে বসে আনন্দে সাথে শ্রবণ করেন।খাইরুদ্দীন পাশা এর এক মাস পর আলজেরিয়া এসে পৌঁছান এবং নিজের বাহাদুর ছেলেকে এই শানদার বিজয়ের জন্য বাহবা বাহবা দেন। এই বিজয় একথার ঘোষণা ছিল যে, খাইরুদ্দীন বারবারোসা নিজ স্থলাভিষিক্তকে পরিপূর্ণ যোগ্য করে তৈরি করেছেন। যে তাঁকে ছাড়া এমনকি তাঁর পরেও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোকে নাকানিচুবানি খাইয়েছেন।

আমিরুল বাহার খাইরুদ্দীন পাশার বয়স বৃদ্ধি সত্ত্বেও তিনি বেশ শক্তিশালী ছিলেন। জিহাদী জযবা তাকে ফরজ আদায়ে সর্বদা প্রস্তুত রাখতো। পুরো ইউরোপ জুড়ে তাঁর এক মহান ব্যক্তিসত্তা অর্জিত হয়েছিল।

১৫৪৪ সালে তিনি ইস্তাম্বুল যান। এর পর তিনি দ্বিতীয়বার আর সমুদ্র সফর করেন নাই। শেষ দিনগুলোতে তিনি নিজের সমস্ত সম্পদ উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং নিজেদের জানবাজ সাথীদের সাহায্যে মুক্ত হস্তে ব্যয় করেন। নিজের মালাকানাধীন ৩০ টি জাহাজ সালতানাতে উসমানীর জন্য ওয়াকফ করে দেন। بشكتاش(ব্যাসিকটাস) শহরে একটি জামে মসজিদ, কবরস্থান এবং অন্যান্য কল্যাণকর কর্মকাণ্ডের জন্য ৩০ হাজার স্বর্ণের লিরা বরাদ্দ করেন। নিজের হাজার হাজার সাথীদেরকে নগদ অর্থ, সম্পত্তি ও অন্যান্য আসবাবপত্র এত পরিমাণে দান করেন যে , তিনি এগুলো দিয়ে বাকী জীবন অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে পারতেন। রুস্তম পাশার কাছে তিনি ২ লাখ ১০ হাজার লিরা ঋণ পেতেন।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব

খাইরুদ্দীন পাশা নিজ ছেলে হাসান বেগ কে অসিয়ত করে যান যে, সে যেন রুস্তম পাশার কাছে কখনো ঋণ না চান এমনকি রুস্তম পাশা দিতে চাইলেও যেন না নেন। এই অসিয়তের পর ৪ ঠা জুলাই ১৫৪৬ সালে ইসলামী বিশ্বের এই অতুলনীয় এডমিরাল যিনি সমুদ্র বক্ষ ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর জন্য সংকীর্ণ করে দিয়েছিলেন, দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। ব্যাসিকটাস শহরে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর সমাধি আজও যেন ইউরোপীয় পরাশক্তিকে ভয় দেখায়‌। আজও সেখানে তুর্কি নৌবহরের অনুষ্ঠান সংগঠিত হয় যাতে এই সমুদ্র সিংহকে হৃদয়ের জয়ধ্বনি পেশ করা হয়‌‌। (রহিমাহুমুল্লাহ)

End sense

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

About bdbarguna24

Check Also

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

Rate this post শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব মওলানা ইসমাইল রেহান হাফি অনুবাদক: মুসাব্বির …

One comment

  1. Pingback: ভারতে ইউরোপীয়দের আগমনের ইতিহাস - BD BARGUNA 24

Leave a Reply Cancel reply