শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব
শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

Rate this post

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

মূল: মাওলানা ইসমাইল রেহান হাফি

অনুবাদ: মুসাব্বির আহমদ তাওসিফ

রঈস বিন আহমদ তৎক্ষণাৎ একটি ফয়সালা করলেন। জাহাজে ঘোষণা করে দেওয়া হল যে, সমস্ত মুসাফির তীরে নামার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। ঘোষণা শোনা মাত্রই সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। যেখানে দেশত্যাগের চেষ্টার শাস্তি হলো অগ্নিকুন্ডের উপর ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে কাবাব বানানো সে জাহান্নামে দ্বিতীয়বার কেউ ফিরতে রাজি নয়। তথাপি তাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা ও অসুস্থ।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

রঈস বিন আহমদ অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে তাদের চুপ করান এবং বলেন, স্পেনীয় বাহিনীর সাথে লড়ার জন্য আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যুদ্ধ জয়ের পর আমরা আবার তোমাদের নিয়ে নিরাপদ স্থানের দিকে যাত্রা করবো। অতঃপর তিনি বেশ দ্রুততার সাথে জাহাজ নিকটবর্তী তীরে নোঙ্গর করেন এবং সমস্ত মুসাফিরদের কিনারায় নামিয়ে দেন। অতঃপর জাহাজগুলোকে যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে স্পেনীয় বাহিরের মুখোমুখি হন। শুরু হয় এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। উভয় দিককার কামান গুলো গর্জে ওঠে গোলা নিক্ষেপ করছে। তীরে দন্ডায়মান হাজারো মুসাফির অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রভুর তরে আহাজারি করে উসমানীয় বাহিনীর বিজয় কামনা করছে। তাদের আহাজারির দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। আর এইদিকে তুর্কি বাহিনী পূর্ণ উদ্যমতার সাথে লড়ে যাচ্ছে। তরবারি ঝনঝনানি ও আল্লাহু আকবারের ধ্বনি ছাড়াও তীর ভর্তি মুসাফিরদের আহাজারি তাদের উদ্যমতাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। প্রতিবার আরো জোরে শোরে হামলা চালাচ্ছে।

পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তুর্কি বাহিনীকে বিজয় দিলেন। স্পেনীয় বাহিনী নিজেদের জাহাজগুলো তুর্কিদের হাতে ছেড়ে পলায়ন করে। অতঃপর রঈস বিন আহমদ পুনর্বার নিজ নৌবহর কিনারায় নোঙ্গর করে নির্যাতিত মুসাফিরদের নিয়ে নিরাপদ মানজিলের দিকে যাত্রা করেন‌। আলজেরিয়ায় পৌঁছে খাইরুদ্দিন পাশাকে এই যুদ্ধের বর্ণনা শুনান, তিনি অনেক খুশি হন এবং এর বিস্তারিত সুলতানকে অবহিত করেন।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

এরপরও উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের বেশ কয়েকটি ঘাঁটি বাকি ছিল। ১৫২৮ সালে খাইরুদ্দিন পাশা সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে হামলা করে ঘাঁটি দখল করে নেন। অতঃপর সেই এলাকার (তিলিসমান) দূর্গে প্রবেশ করেন যেখানে তার ভাই আরুজ যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন আন্দ্রে ডোরিয়া। গোটা ইউরোপ জুড়ে তার বেশ নামডাক। বয়স ৭০ বছর। নৌযুদ্ধে তাকে অদ্বিতীয় মনে করা হয়। সে বারবার আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে হামলা করছিল। তাই খাইরুদ্দীন পাশা তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার জন্য একটি নতুন বাহিনী প্রস্তুত করেন।

এদিকে স্পেনীয় সম্রাট পঞ্চম চার্লসও খাইরুদ্দিন পাশাকে চিরতরে নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য নিজ কমান্ডে বিশাল এক যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। ৫০০ জাহাজ এবং ৩০ হাজার সৈনিক সম্বলিত নৌ বহর নিয়ে বেশ জাঁকজমকের সাথে স্পেনের বার্সেলোনা বন্দর থেকে রওনা হয়। ১৫৩৫ সালের ২৯ শে মে এই বাহিনী আচমকা তিউনিসিয়ার কূলে অবতরণ করে এবং দারুল হুকুমত কে অবরুদ্ধ করে। খাইরুদ্দিন পাশা ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু স্থানীয় লোকেরা ভয় পেয়ে যায়। তিউনিসিয়ার ৬ হাজার বারবার রাজাকার জেলে থাকা ১০ হাজার খ্রিস্টান বন্দিকে মুক্ত করে দিয়ে নিজেরাও খ্রিস্টান বাহিনীতে শামিল হয়ে যায়। পাশা দেখলেন যে এখন খুব বেশি একটা সুবিধা করা যাবে না। তাই তিনি প্রতিপক্ষের ঘেরাও ভাঙ্গার জন্য জোরেশোরে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু চার্লস যেভাবেই হোক খাইরুদ্দিন পাশাকে জীবিত গ্রেফতারের চেষ্টায় কঠিনভাবে অবরোধ করে রেখেছে। এজন্য খাইরুদ্দীন পাশা প্রথম হামলায় আড়াই হাজার যোদ্ধা হারিয়েছেন। দ্বিতীয়বার হামলার ৭ হাজার ২০০ সিপাহী নিয়ে বের হন কিন্তু এবারও শত্রুপক্ষের ঘেরাও ভাঙতে পারেননি। খাইরুদ্দিন পাশা পিছু হটে শহরের দিকে এসে হয়রান হয়ে যান যে, শহরের মধ্যে বিদ্রোহ হয়ে গেছে। খ্রিস্টান কয়েদিরা শহরের উপর দখল নিয়ে ফেলেছে এবং দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন পাশা উভয় দিক দিয়ে কঠিন ঘেরাওয়ে পড়ে গেলেন।খাইরুদ্দিন পাশা তথাপিও হাতিয়ার ফেলতে রাজি নন।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

তাই তিনি জীবন-মৃত্যুর তোয়াক্কা না করে প্রতিপক্ষের উপর এমন ভয়ঙ্কর হামলা করেন যে শত্রু বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। আর খাইরুদ্দিন পাশা এই ফাঁকে নিজ বাহিনী নিয়ে অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে যান। খ্রিস্টান বাহিনী ধাওয়া করে, কিন্তু পাশা নিজ বাহিনী সমেত এমনভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলেন যেন জমিন তাকে গিলে ফেলেছে। সম্রাট চার্লস এই মর্দে মুজাহিদের জীবিত ফেরার কারণে রাগে ক্ষোভে ফেটে যায় এবং নিজ সালারদেরকে গালমন্দ করা শুরু করে।

বিজয়ের পর খ্রিস্টান বাহিনীর ৩০ হাজার শহরবাসীকে হত্যা করে, ১০ হাজার মানুষকে গোলাম বানিয়ে বিক্রি করে দেয়, শতাধিক মসজিদকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে, অসংখ্য লাইব্রেরীকে ধ্বংস করে দেয়। জামে মসজিদের সামনে কিতাবের এই পরিমাণ স্তূপ হয়েছিল যে, ঐগুলো টপকানো ব্যতীত মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া যেত না। ক্রমে ক্রমে শহরবাসীর ইমান-সম্মান, ইজ্জত-আব্রু নষ্ট করার চেষ্টা করে। সম্রাট চার্লস যখন তিউনিসিয়ায় প্রবেশ করে তখন শহরে কসাইখানার মত দৃশ্য বিরাজ করছিল। পশ্চিমা ঐতিহাসিক হাইমার ( ہیمر) লিখেন, ওই দিনগুলোতে সুলতান সুলাইমান নিজের ঘৃণ্য শত্রু সাফাভি শিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ শহর বাগদাদ এবং তাবরিজে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি কোন লুটতরাজ বা খুনাখুনি হতে দেন নাই। তিউনিসিয়া পতনের ষষ্ঠ দিন খাইরুদ্দিন পাশা আলজেরিয়া এসে পৌঁছান। তার অধিকাংশ সৈন্য শহীদ হয়ে গিয়েছিল।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

১৫৩৭ সালে ষষ্ঠ পোপ পল জন ইউরোপকে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান।ডাক দেন হলি লীগের। ফলে ক্রুসেডারদের এক বিরাট বড় সম্মিলিত নৌবহর প্রস্তুত হয় যায়। যাতে ৩০৮টি যুদ্ধজাহাজ এবং ২৯২টি ছোট ছোট জাহাজ ছিল। নৌসৈন্যের পরিমাণ ছিল ৬০ হাজার। পুরো ইউরোপীয় বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল কমান্ডার আন্দ্রে ডোরিয়া কে। এদিকে খাইরুদ্দিন পাশা রোডস এবং ক্রিয়েট (کریٹ)এর মাঝখানে অবস্থিত কিরবা (کربہ) এর দ্বীপগুলো বিজয় করেন। ওই সময়ই তিনি জানতে পারেন যে, ইউরোপীয় সম্মিলিত নৌবহর তাকে অবরোধ করার জন্য আসছে। খাইরুদ্দিন পাশা নিজ সালারদের সাথে পরামর্শ করেন। তারা মতামত দিলেন যে, প্রিভেজার তীর পর্যন্ত পিছু হটাই মুনাসিব হবে। সেখানে অবস্থান করে শত্রুবাহিনীর অপেক্ষা করা হবে। যখন শত্রু সেখানে পৌঁছবে তখন কেল্লায় স্থাপিত তোপ দিয়েও তাদের উপর হামলা করা যাবে এবং স্থলভাগের সৈনিকরাও আমাদের সাহায্য করতে পারবে।

খাইরুদ্দীন পাশা বলেন “সমুদ্র যুদ্ধ সর্বদা খোলামেলা সমুদ্রেই সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক। তীরে নয়। যদি আমরা তীরের নিকটে থাকি তাহলে আমাদের জাহাজগুলোকে স্বাধীনভাবে এদিক সেদিক নাড়ানো এবং নিজেদের ইচ্ছামত কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবেনা।”

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

খাইরুদ্দীন পাশা ১২২ টি জাহাজ এবং ২২ হাজার সৈন্যসহ এই বিরাট শক্তির মোকাবেলায় বের হন এবং তীর থেকে নয় কিলোমিটার সামনে এগিয়ে যান। যখন দুশমনের নৌবহর দেখা যাচ্ছিল তখন পাশা নিজের জাহাজের পালগুলো খুলে জাহাজগুলোকে অন্যদিকে নিয়ে যান। প্রতিপক্ষের পিছু ধাওয়ার পরে তিনি ইউনান (গ্রীস) এর পশ্চিম তীর ‘امور اکیکوس’ এর নিকটবর্তী প্রিভেজার সীমানায় থেমে প্রতিপক্ষের অপেক্ষা করেন। ২৫ শে সেপ্টেম্বর ১৫৩৮ সালের প্রভাতে উভয় বাহিনীর নৌবহর এতোটুকু নিকটবর্তী এসে যায় যে, দূরবীন ছাড়াই একে অপরকে দেখা যাচ্ছিল। পরিশেষে উভয় দিককার কামান গর্জে ওঠে! এবং তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। খাইরুদ্দীন পাশা নিজে হালকা-পাতলা জাহাজগুলোকে দ্রুততার সাথে এদিক-সেদিক সরিয়ে শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ইউরোপের জাহাজগুলো বড় এবং ভারী হওয়ার দরুন এদিক-সেদিক দ্রুত তারা স্থান ত্যাগ করতে পারছিল না।

End Sense

https://bdbarguna24.com/2022/01/%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%ab%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b2/%e0%a6%87%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae/2468/

About bdbarguna24

Check Also

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

Rate this post শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব মওলানা ইসমাইল রেহান হাফি অনুবাদক: মুসাব্বির …

One comment

  1. Pingback: হযরত আলী ( রা: ) এর জীবনী - BD BARGUNA 24

Leave a Reply Cancel reply