শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব
শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

Rate this post

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

মওলানা ইসমাইল রেহান হাফি

অনুবাদক: মুসাব্বির আহমাদ তাওসিফ

আমিরুল বাহার খাইরুদ্দিন বারবারোসা ইসলামের ইতিহাসের অবিস্মরণীয় এক এডমিরাল। যার বাহিনী পশ্চিমা উপনিবেশের আক্রমণের সামনে ইসলামী বিশ্বের জন্য এক শতাব্দী পর্যন্ত মহাপ্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। যেখানে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা এই মহান ব্যক্তিকে জলদস্যু বলে প্রচার করেছে সেখানে কতক মুসলিম ঐতিহাসিকও এই বাহাদুর এডমিরাল এর সাথে ইনসাফ করে নি। তারা তাকে এমন এক অমুসলিম জলদস্যু হিসেবে উপস্থাপন করেছে যে উসমানীয়দের হাতে বন্দী হওয়ার পর বাহিনীতে সম্পৃক্তির শর্তে ইসলাম কবুল করেছেন। তথাপিও তার ব্যক্তিসত্তা জলদস্যুদের মতোই ছিল।

এটা পড়ে আমি অত্যন্ত পেরেশান হয়ে গিয়েছি যে, কিভাবে আমাদের ইতিহাসকে বিকৃত করে ফেলা হয়েছে এবং কিভাবে বারবারোসা ভাতৃদ্বয়কে ভিলেন হিসেবে সিনেমা থেকে কম্পিউটার সর্বস্ক্রিনে শয়তানের রূপে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

তুর্কিরা যদি নিজেদের পুরোনো ইতিহাসের পাতা উল্টায় তাহলে তাদের কাছে বিষয়টি একদম স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এই ব্যক্তি কত মহান ছিলেন এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতি তার কি পরিমাণ ছিল ইহসান ছিল। আমি খাইরুদ্দীন বারবারোসা সম্পর্কে তুর্কি ঐতিহাসিকদের কলম নিঃসৃত কথাগুলোই লিখব:

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

খাইরুদ্দিন বারবারোসার দাদা আব্দুল্লাহ আগা তুর্কি ফৌজের একজন সাধারণ অফিসার ছিলেন। তার ছেলে নুরুল্লাহ ইয়াকুব আগার পাঁচ ছেলের মধ্যে আরুজ এবং খাইরুদ্দিন খিজিরই সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করে। তারা দুজনেই উসমানী বাহিনীর নৌ-অফিসার ছিলেন। আরুজ বছরের পর বছর ইউরোপীয় নৌবহরের সাথে যুদ্ধ করেছেন। অতঃপর ১৫১৮ সালে স্পেনের এক যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। এরপর খাইরুদ্দিন পাশাকে আমিরুল বাহার পদ দেয়া হয়।

তিনি আরুজ কে শহীদ কারী এবং আন্দালুসের মুসলমানদের উপর অত্যাচারী স্পেনীয় বাহিনী থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র দেরি করেন নাই। ১৫১৯ সালে প্রতিশোধের লক্ষ্যে নিজ বহর নিয়ে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া বন্দরে পৌঁছান। তাঁর অতর্কিত হামলায় বন্দরে থাকা সমস্ত স্পেনীয় জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্পেনের সাথে আরো কয়েক দফা যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

বেশ কয়েকবার স্পেনীয় নৌবহরও খেলাফতে উসমানীর অধীনে থাকা উত্তর আফ্রিকার এলাকা তিউনিসিয়া, লিবিয়া এবং আলজেরিয়ায় হামলা করে এবং প্রত্যেকবারই খাইরুদ্দিন বারবারোসা তাদের দৃষ্টান্তমূলক পরাজয় উপহার দেন। কাফেরদের সাথে খাইরুদ্দিন বারবারোসার একের পর এক যুদ্ধাভিযান অব্যাহত থাকে। ১৫২০ সালে সুলতান ইয়াভুজ সেলিম এর মৃত্যুর পর ইস্তাম্বুলে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করেন সুলতান সুলাইমান আল কানুনী। যার সময়কালকে উসমানি সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগও বলা হয়।

তৎসময়ে পৃথিবীতে দুটি পরাশক্তি দৃশ্যমান ছিলো।যার মধ্যে একটি হলো উসমানীয় সাম্রাজ্য আর অপরটি স্পেনীয় সাম্রাজ্য। স্পেনের মুসলিমদের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল তা সুলতান সুলাইমানের কাছে গোপন ছিলনা। এজন্য তিনি স্পেনীয়দের থেকে প্রতিশোধ নিতে চাইতেন। স্পেন তখন অনন্য শক্তিশালী একটি রাজ্য ছিল। যারা উসমানীয়দের সাথে টক্কর দিত।

ভয়ানক এই উপনিবেশিক শক্তি দিন দিন পূর্বদিকে বেড়ে মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পশ্চিম দিকে আটলান্টিক সাগর অতিক্রম করে আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আমেরিকায় থাকা স্বর্ণ-রৌপ্যের খনি থেকে এই পরিমাণ সম্পদ স্পেনে পৌঁছেছিল যে, স্পেনীয় খ্রিস্টানরা সমগ্র বিশ্ব বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিল। সুলতান সুলাইমান দৃঢ় সংকল্প করেন যে, এই পরাশক্তিকে টুকরো টুকরো করেই তবে ক্ষান্ত হবেন।

এজন্য তিনি স্পেনে দু-তরফা হামলার পরিকল্পনা আঁটেন। স্থলভাগে মধ্য ইউরোপের রণাঙ্গণে স্বয়ং নিজেই কমান্ড করবেন এবং জলভাগের কমান্ড খায়রুদ্দিন বারবারোসার কাছে অর্পণ করেন। এই পরিকল্পনা মোতাবেক যুদ্ধের যে সিলসিলা শুরু হয়েছিল তা দুই দশক পর্যন্ত জারি ছিল। তুর্কিদের একের পরে এক সফলতা অর্জিত হচ্ছিল কিন্তু ইতিমধ্যেই আলজেরিয়ার স্থানীয় আমিররা উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। এ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর খাইরুদ্দিন বারবারোসা আমীরদের একত্রিত করেন এবং তাদেরকে বলেন: “আমরা এখানে মুসলমানদের রক্ত ঝরানোর জন্য নয় বরং জিহাদ করার জন্য এসেছি। মুসলমানদের গর্দান কাটার দায়ভার তোমাদের উপর পতিত হবে।”

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

এই বলে এই মহান ব্যক্তি আলজেরিয়ার দারুল হুকুমতের চাবি স্থানীয় আমীরদের কাছে অর্পণ করে নিজ বহর নিয়ে নতুন গন্তব্যের দিকে রওনা হয়ে যান। খাইরুদ্দীনের কাছে তখন ৪০টি জাহাজ ছিল ।মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য একটি শক্তিশালী বন্দরের খুব প্রয়োজন ছিল।

এদিকে আলজেরিয়া থেকে তুর্কিদের প্রত্যাবর্তনের পর স্পেনীয়রা ফের হামলা চালাতে শুরু করে। বাধ্য হয়ে তখন আলজেরিয়ার আমিরগণ পুনরায় খাইরুদ্দিন বারবারোসার শরণাপন্ন হন এবং ফিরে এসে দেশের ব্যবস্থাপনা নিজ হাতে নেওয়ার অনুরোধ করেন। চার বছর পর খাইরুদ্দিন দ্বিতীয়বার আলজেরিয়ায় এসে পৌঁছান এবং সেখানকার লোকেরা তাকে শানদার সংবর্ধনার মাধ্যমে বরণ করে নেয়।

এদিকে স্পেনীয় ফৌজ ‘পিনান’ (پینن) নামক স্থানে বিশাল এক কেল্লা নির্মাণ করে সেখানে নিজেদের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে। স্পেনের নামকরা জেনারেল ডন মার্টিন সেখানে অবস্থান করছিল যার সাথে যুদ্ধ করে খাইরুদ্দিন এর ভাই আরুজ শহীদ হয়েছিলেন। খাইরুদ্দিন পাশা কেল্লাকে অবরোধ করেন এবং টানা ২০ দিন গোলাবর্ষণের পর ২৭ শে মে ১৫২৯ সালে দুর্ভেদ্য এই কেল্লার প্রাচীরে নিজেদের পতাকা উড়ান। সাথে সাথে ডন মার্টিন এবং তার সিপাহীদের বন্দী করেন।

খাইরুদ্দিন পাশার এসব বীরত্বপূর্ণ কর্মকান্ড দেখে সুলতান সুলাইমান তাকে পুরো উসমানীয় সাম্রাজ্যের ”আমিরুল বাহার” (প্রধান এডমিরাল) ঘোষণা করেন। সুপ্রশস্ত অধিকার পাওয়ার পর এই মর্দেমুজাহিদ’ নৌসেনাদের প্রতি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন। কঠিন থেকে কঠিনতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ সাঁতারু, ডুবুরি, নাবিক, তলোয়ার- খঞ্জর চালক, নিশানা বাজ হিসেবে গড়ে তোলেন।

পুরাতন তোপের স্থলে নতুন তোপ আনেন। পুরাতন জাহাজগুলো জায়গায় এমন সব নতুন জাহাজ তৈরি করেন যেগুলো মজবুত হওয়ার সাথে সাথে হালকা হওয়ার কারণে দ্রুতগামীও ছিল। এভাবে সুলতান সুলাইমানের আমলে উসমানী নৌবহর এতই শক্তিশালী হয়ে যায় যে অতীতে তার কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি পরবর্তী ২০০ বছর পর্যন্ত উসমানী নৌবহরের অবস্থা এমনই ছিল। যাকে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো ভয় পেত। নতুন বাহিনীকে সঠিক প্রশিক্ষণের পর তিনি স্পেনের মুসলমানদের সাহায্য করার জন্য নতুন যুদ্ধাভিযানের সিদ্ধান্ত নেন।

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দিন বারবারোসা ১ম পর্ব

আর এই অভিযানের কমান্ড অর্পণ করেন নিজ শাগরেদ রঈস বিন আহমাদ এর কাছে। যাকে মুসলমানরা ”কাফেরদের মৃত্যুদূত” আর স্পেনীয়রা ”সমুদ্র শয়তান” বলে ডাকতো। রঈস বিন আহমদ স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া বন্দর আক্রমণ করেন এবং হাজারো মজলুমকে মুক্ত করে তীর থেকে দূরে চলে যেতে লাগেন। কিন্তু পথিমধ্যে স্পেনের এডমিরাল ফার্নানেন্ড পিছু তাড়া করে তাকে ঘিরে ফেলেন এবং জাহাজে আরোহী সমস্ত স্পেনে মুসলমানদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন যাতে করে তাদের হত্যা করে আন্দালুসের অবশিষ্ট মুসলমানদের শিক্ষা দিতে পারে। রঈস বিন আহমাদ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে, মুসাফির পূর্ণ এই জাহাজ দিয়ে স্পেনীয় জাহাজের মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।

আরো জানুন 

পরবর্তী পর্ব 

About bdbarguna24

Check Also

শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব

Rate this post শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব মূল: মাওলানা ইসমাইল রেহান হাফি অনুবাদ: মুসাব্বির আহমদ তাওসিফ রঈস …

3 comments

  1. Pingback: শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা ২য় পর্ব - BD BARGUNA 24

  2. Pingback: শেরে সমন্দর খাইরুদ্দীন বারবারোসা শেষ পর্ব - BD BARGUNA 24

  3. Pingback: হযরত আলী ( রা: ) এর জীবনী - BD BARGUNA 24

Leave a Reply Cancel reply