মোটা চাল নাকি এখন কেবল গরুর খাদ্য, দাম বেড়েছে তো কী হয়েছে
মোটা চাল নাকি এখন কেবল গরুর খাদ্য, দাম বেড়েছে তো কী হয়েছে

মোটা চাল নাকি এখন কেবল গরুর খাদ্য, দাম বেড়েছে তো কী হয়েছে

Rate this post

মোটা চাল নাকি এখন কেবল গরুর খাদ্য

দাম বেড়েছে তো কী হয়েছে

এক সময় সড়কটির নাম ছিল মিরপুর সিরামিক গলি। এখন অবশ্য কোনো গলি নেই। মেট্রোরেলের কাজের কারণে রাস্তাটি প্রশস্ত ও পাকা করা হয়েছে। মিরপুর ডিওএইচএস নামে নতুন বসতি গড়ে ওঠায় মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। আবার এর আশেপাশে অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস। ওই সড়কে নতুন অতিথি টিসিবির ট্রাক। ট্রাকের সামনের লাইন দিন দিন বড় হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হাতাহাতি হয়। তবে সবাই এতে অংশ নেয়নি। বিশেষ করে মধ্যবিত্তরা নীরব।

এ ছবি শুধু মিরপুরের নয়। নগরীর যেখানেই টিসিবির ট্রাক দাঁড়িয়েছে, সবখানেই একই চিত্র। সারি সারি মানুষ বাড়ছে। কারণ, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই। টিসিবি এখন চারটি পণ্য বিক্রি করছে। সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, পেঁয়াজ এবং চিনি। তারা চাল বিক্রি না করলে মানুষের এই লাইন আরও দীর্ঘ হতো। কারণ চালের দামও বাড়ছে।

মোটা চাল নাকি এখন কেবল গরুর খাদ্য, দাম বেড়েছে তো কী হয়েছে

এই সময়ে দেশে সাধারণত চালের দাম কম থাকে। তবে এবার সব ধরনের চালের দাম আরেক দফা বেড়েছে। পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই জরিমানা ও মাঝারি চালের দাম কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেড়েছে। মোটা চালের খুচরা দাম আবার কেজিপ্রতি ৪৮ টাকায় পৌঁছেছে। এই অ্যাকাউন্টটি সরকারের কৃষি বিপণন বিভাগের অন্তর্গত। তবে মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বড় আবাসিক এলাকায় মোটা চাল ৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে মোটা চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। গত রোববার এ কারণ জানান তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রিকশাচালকরা এখন মোটা ভাত খায় না। মোটা চাল এখন গরুকে খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশে এখন কুঁড়েঘর নেই, কুঁড়েঘর শুধু কবিতায়। আজ সেই কুঁড়েঘরে কাঠ ও গরু রাখা হলেও মানুষ নেই। ‘
তাই মোটা চালের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য কেউ জোরেশোরে উঠবে বলে ধরেই নিয়েছিলাম। তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এ বিষয়ে যত কম বলা যায় ততই ভালো। তারপরও চালের দাম নিয়ে কথা বলতে হবে। এর কারণ তথ্যমন্ত্রী নয়, কৃষিমন্ত্রী ড.

গত মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। বিষয় হল D-7 বৈঠকে কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এ বিষয়ে অনলাইন প্রেস ব্রিফিং করেছেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এমনটাই বলা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির শেষ অংশে চোখ আটকে গেল। তিনি বলেন, প্রতি বছরই চালের দাম বাড়ছে। বাজারে পর্যাপ্ত চাল রয়েছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে বর্তমানে বিশ্ববাজারে গমের দাম বেড়েছে। গমের দাম বাড়লে চালের দামও বাড়ে। দেশে ১০ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। প্রতি বছর 22-24 লাখ নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু চাল পশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব সমস্যা ও কিছুটা মূল্যস্ফীতির কারণে চালের দাম একটু বেশি। কিন্তু বাজারে চাল পাওয়া যাচ্ছে না বা মানুষ কিনতে পারবে না এমন কোনো পরিস্থিতি নেই। দেশে এই মুহূর্তে কোনো খাদ্য সংকট নেই।

এই বিবৃতিটি পড়লে মনে হয়, অর্থনীতিকে নতুন করে পড়ার সময় এসেছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে চালের দাম বেশি—এটা নতুন আবিষ্কার। কারণ, অর্থনীতি অনুসারে, মুদ্রাস্ফীতি হল সামগ্রিক মূল্য স্তরের এক সময় থেকে অন্য সময়ে পরিবর্তন। আর যখন মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই মুদ্রাস্ফীতিকে অর্থনীতির নীরব ঘাতক বলা হয়। আয় না বাড়লেও আগের তুলনায় একই পণ্য কিনতে বেশি টাকা খরচ হয় বলে একে বাধ্যতামূলক করও বলা হয়। অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যানের মতে, মুদ্রাস্ফীতি হল নিম্ন-প্রতিনিধিকৃত করের নাম।

সর্বশেষ পারিবারিক আয় এবং ব্যয় জরিপ 2016 সালে পরিচালিত হয়েছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দ্বারা পরিচালিত একটি জরিপ অনুসারে, একটি পরিবারের মোট মাসিক আয়ের 47.80 শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করা হয়। আর যারা দরিদ্র বা অতি দরিদ্র, তাদের আয়ের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খাবারে ব্যয় হয়। খাদ্যপণ্যে চালের পরিমাণ বেশি। তাই চালের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির প্রধান শিকার হয় দরিদ্র মানুষ।

মূল্যস্ফীতির হিসাব করলে খাদ্যপণ্যের শেয়ার সবচেয়ে বেশি ৮৫৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। তাই খাদ্যের দাম, বিশেষ করে চালের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতিও বাড়বে। সরকারের হিসাবে, দেশে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। কয়েক মাস ধরে এই হার বাড়ছে। তাই মূল্যস্ফীতি একটু বেশি, আর এ কারণে চালের দামও বেশি। কৃষিমন্ত্রীর এই বক্তব্য বেশ বিভ্রান্তিকর। বরং উল্টো। চালের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে খাবারের দামও। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যবহির্ভূত সূচকেও মূল্যস্ফীতি বেশি। কৃষিমন্ত্রীর মতে, মুদ্রাস্ফীতির সংজ্ঞা বদলাতে হবে নয়তো অর্থনীতিকে নতুন করে শিখতে হবে।

মোটা চাল নাকি এখন কেবল গরুর খাদ্য, দাম বেড়েছে তো কী হয়েছে

তবে কৃষিমন্ত্রীর ভাষণের শেষ অংশটি পড়ে বোঝা যাচ্ছে, অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের পক্ষে। কৃষিমন্ত্রীর মতে, বাজারে চাল পাওয়া যাচ্ছে, সবাই কিনতে পারবে এবং দেশে কোনো খাদ্য সংকট নেই। কিন্তু 30 বছর ধরে অমর্ত্য সেন বলে আসছেন যে বাজারে চাল পাওয়াই শেষ কথা নয়। তাদের সেই চাল কেনার সামর্থ্য আছে কি না তা বড় প্রশ্ন। এজন্য তিনি কপিরাইটের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অমর্ত্য সেন লিখেছেন, ‘বাজারে খাবারের ব্যবসা হয়। যারা খুবই দরিদ্র, তাদের আয়ের বেশির ভাগই চলে যায় খাবার কিনতে। আয়ের অভাবে অনেক সময় মানুষের ক্ষুধা মেটে না। ‘ এভাবেই শুরু করলেন অমর্ত্য সেন। আর এখন সব অর্থনীতিবিদই বলছেন দুর্ভিক্ষের কারণ খাদ্য সংকট নয়, বণ্টন সমস্যা। মূল বিষয় হল মালিকানা।

অমর্ত্য সেন এত বছর ধরে বলে আসছেন, কিন্তু কাজ হয়নি। কারণ, এখনো কোনো খাদ্য সংকট নেই—এতে আটকে আছেন আমাদের মন্ত্রীরা। কিন্তু করোনার দুই বছরে কত লোক তাদের আয় হারিয়েছে, কত লোক চাকরি হারিয়েছে, কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, কতজন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। তবে এর কিছু অংশ টিসিবির ট্রাকের সামনে পাওয়া যায়। মন্ত্রীরা কি সেখানে যাবেন?

Sourece: Prothomalo.com

About bdbarguna24

Leave a Reply Cancel reply